ঈদঃ দেশে দেশে ঈদ-উল-ফিতরের উৎসব উদযাপন

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।

মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় ও আনন্দের উৎসব ঈদ -উল-ফিতর নিয়ে বাঙ্গালি কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কালজয়ী গান। হ্যাঁ দীর্ঘ এক মাসের রমজানের ত্যাগ ও তিতিক্ষার পর ঈদ-উল- ফিতরের আনন্দে মশগুল হয়ে যায় পুরো মুসলিম জাহান। দিন ভর চলে আনন্দ উল্লাস আর সাথে সেমাই, কাবার, কোফতা, কোর্মা আর বিরিয়ানি থাকেই।

ঈদ
Eid al-Fitr prayer By Gunawan KartapranataOwn work, CC BY-SA 3.0, Link

ঈদুল ফিতর (আরবি: عيد الفطر অর্থাৎ “রোযা ভাঙার দিবস”) ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দুটো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের একটি। মাহে রমজান মাসের পূর্ণ একটি মাস সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে মুসলমানরা উদযাপন করে।

পাঠক জানেন কি  ঈদের প্রচলন কীভাবে শুরু হয় ?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মাক্কা থেকে মাদীনায় হিজরত করলেন তখন মাদীনাবাসীদের মধ্যে বিশেষ দু’টি দিবস ছিল, সে দিবসে তারা খেলাধুলা করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন এ দু’টি দিনের তাৎপর্য কি ? মাদীনাবাসীরা উত্তর দিল আমরা জাহেলী যুগ থেকে এ দু’দিনে খেলাধুলা করে আসছি। তখন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন এ দু’দিনের পরিবর্তে এর চেয়েও উত্তম দু’টি দিন তোমাদেরকে দান করেছেন। আর সেই দিন দু’টি হল : ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর।” (আবূ দাউদ) এটা প্রথম হিজরির কথা। মূলত তখন থেকেই মুসলিমরা ঈদ উদযাপন করে আসছে। যদিও ভারতীও উপমহাদেশে ঈদের প্রচলন হয়েছিলো আরও অনেক পরে, মোঘলদের সময়।

বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে ঈদ উদযাপিত হয়ে থাকে। তবে সব জায়গার মুসলমানরা কিন্তু পুরোপুরি একইভাবে ঈদ উদযাপন করে না। দেশে দেশে ঈদের রকমসকম একটু হলেও পাল্টে যায়। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নিয়মে পালিত হয় পবিত্র ঈদ উৎসব। আবার দেশ বিভেদে ঈদ উৎসবের নামও বিভিন্ন। যেমন তামিল অঞ্চলে ননবু পিরানাল, ইন্দোনেশিয়ায় হারি লিবারান, ব্রুনাইয়ে সাইদিল ফিতরি, মালয়েশিয়ায়হারি রয়া পুয়ামা বলা হয় আর বাংলাদেশে ও ভারতের পশ্চিম বাংলায় ঈদ-উল-ফিতরকে বলা হয় রোজার ঈদ। এছাড়া  সুদানে বোদোরান সিয়াম, জাভায় এনগাইদুল ফিতরি, তুরস্কে কুচুক ব্যারাম, সিন্ধুতে ঈদ নিমাহ, পশতুরো কোসানে হি সুপআকতার, ক্লোয়েশিয়ায় রামজানস্কে বাহরাম নামে ডাকা হয়। 

By HamzaelbaciriOwn work, CC BY-SA 4.0, Link

 ঈদের চাঁদ

ছবিঃ http://uttorpurbo24.com

ছোটবেলায় ২৯ রোজায় ইফাতারের পরে কি ঘরে বসে থাকার জো ছিল ? চাঁদ মিস হলে যেন ঈদটাই মাটি। আর চাঁদ দেখার কী যে উত্তেজনা! এই চাঁদ রাতের উদযাপনও কিন্তু আছে ভিন্নতা। ইন্দোনেশিয়া আর মালয়েশিয়াতে চানরাতের নাম ‘তাকবীরান’। ওই দুই দেশে মুয়াজ্জিনরা মসজিদ থেকে তাকবীর দিতে শুরু করে। আমাদের দেশে চাঁদ দেখা গেলেই মসজিদ থেকে ভেসে আসে ‘ঈদ মোবারক’ সম্ভাষণ আর শুভেচ্ছা। দক্ষিণ আফ্রিকায় ঈদের আগের দিন যখন ঈদের চাঁদ দৃষ্টিগোচর হয় তখন সবাই একত্রিত হয়ে হর্ষোল্লাস করে। চাঁদ দেখতে কেপ টাউনের গ্রিন পয়েন্টে এসে জড়ো হয় অনেক দক্ষিণ আফ্রিকান। সঙ্গে থাকে ইফতারি। সবাই মিলেমিশে খায়। এবং পরে সবাই একত্রে মাগরিবের নামাজ আদায় করে।

ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক!

ঈদের দিন বা ঈদের পরের কিছু দিন কারও সঙ্গে দেখা হলেই আমরা সোল্লাসে বলে উঠি, ‘ঈদ মোবারক!’ এটা আমাদের ঈদের। স্থান ভেদে ঈদের সম্ভাষণে পার্থক্য দেখা যায়, যেমনঃ ইন্দোনেশিয়রা বলে, ‘সেলামাত ঈদুল ফিতর। মোহন মাফ লাহির দান বাতিন’ মানে ‘ঈদ-উল-ফিতরের শুভেচ্ছা। প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব কিছুর জন্য আমাকে মাফ করো’। মালয়েশিয়রাও এই সম্ভাষণ ব্যবহার করে। শুধু আগে জুড়ে নেয় সেলামাত হরি রায়া।  আফগানরা ব্যাবহার করে লম্বা-সম্বা একটা সম্ভাষণ ‘ঈদেত মোবারাক রোজা ওয়া নামাজেত কাবুল দাখিল হাজিহা ওয়া গাজিহা’ বা ‘ঈদ মোবারক, তোমার নামাজ-রোজা কবুল হোক, তোমার হজ্ব সফল হোক’। তুর্কিরা আবার এককাঠি বেশি সরেস তারা শুধু ‘বায়রামিনিজ মুবারেক ওলসুন’ বলেই খেন্ত দেয়না, যাকে সম্ভাষণ করছে, তার ডান হাতে চুমু খেয়ে কপালেও ঠেকিয়ে নেয়! তবে পৃথিবীর প্রায় অনেক দেশই আমাদের মতো ‘ঈদ মোবারক’ সম্ভাষণ ব্যবহার করে। তবে আমাদের প্রিয় নবি (সঃ) এবং সাহাবীরা ঈদ সম্ভাষণে ‘ঈদ মোবারক’ কিংবা উপরে উল্লেক্ষিত কোন সম্ভাষণ ব্যাবহার করে নি। ‘তাকাবাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ বলে সাহাবীরা একে অপরকে ঈদে সম্ভাষণ করতো।

দেশে দেশে যেমন ঈদ

ঈদ নামাজ By User:Alhaj Nasir UddinOwn work, CC BY-SA 3.0, Link

সৌদি আরবঃ সৌদি আরবে ঈদ অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে পালিত হয়। দোকানগুলোতেও তখন উপহারের মেলা লেগে যায়। যেমন কেউ চকলেটের দুটো বাক্স কিনল। তাতে মিলবে চকলেট পরিবেশন করার জন্য এক সুদৃশ্য ডিশ একেবারে বিনামূল্যে। সৌদিরা ঈদের নামাজ শেষে ছেলে বুড়ো একে অপরের সাথে তাদের ঐতিহ্যবাহী কোলাকুলি করেবয়স্করা শিশুকিশোরদের হাতে অর্থ দেয়বাচ্চারা সুদৃশ্য ব্যাগ বহন করেযেখানে অর্থ ছাড়াও থাকে ক্যান্ডি, খেলনা ইত্যাদি। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে ঈদউলফিতরের উৎসব শুরু রমজানের প্রথম দিবস থেকেসৌদি আরবের অনেক অঞ্চলে পুরো রমজান মাস জুড়ে চলতে থাকে উৎসব

দক্ষিণ আফ্রিকাঃ কেপ টাউনের গ্রিন পয়েন্ট থেকে আনুষ্ঠানিক চাঁদ দেখার ঘোষণা দেয়। এখান থেকেই শুরু হয় দক্ষিন আফ্রিকার ঈদ-উল-ফিতরের আমেজ। সকালে ঈদের নামায আদায়ের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় ঈদ। নতুন জামাকাপড় পড়ে আত্মীয় এবং প্রতীবেশীদের বাসায় যাওয়া আর সুস্বাদু সব বিভিন্ন রকমের কেক,বিস্কুট খাওয়া বাচ্চাদের জন্য এক আনন্দময় ব্যাপার। এখানকার শিশুরা বড়দের কাছ থেকে বিভিন্ন রকম উপহার পেয়ে থাকে প্রতি ঈদে।

তুরস্কঃ তুরস্কে উৎসবের দিনকে সেকার বৈরামী বা রামাদান বৈরামী বলা হয়ে থাকে। ঈদ উপলক্ষে মূলত তুরস্কে তিন দিন সরকারি ছুটি থাকে। তবে প্রথম বৈরামী দিনটি তুরস্কে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দিনে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে পুরুষরা পার্শ্ববর্তী মসজিদে নামাজ পড়তে যায়। নামাজের পর সবাই একত্রিত হয় কবরস্থানে যায় সেখানে শায়িত মৃত আত্মীয়স্বজনদের নাজাত ও চিরশান্তি কামনা করে পাঠ করা হয় জিয়ারত। অনেক পরিবার আবার সমুদ্র সৈকতে, প্রমোদ উদ্যানে, সিনেমায়, থিয়েটারে বা নীল নদীতে প্রমোদ-ভ্রমণে গিয়ে ঈদের ছুটি উপভোগ করে। টিভিতেও ঈদ উপলক্ষে চলে মনোরঞ্জনের অন্তহীন কার্যক্রম।

নাইজেরিয়া ও সেনেগালের মুসলমানরা ড্রাম বাজিয়ে ঈদ-উল-ফিতরকে স্বাগত জানায়। নাইজেরিয়ায় ঈদের উৎসবে মুসলমানদের সাথে যোগ দেয় খ্রিস্টানরাও। হাউসা ভাষায় তারা বারকা দা সাল্লা বলে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করে। 

অমুসলিম দেশ চীনে ঈদ-উল-ফিতর শান্তিপূর্ণ ভাবে পালন করা হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা জিনজিয়ান ও নিংজিয়া প্রদেশে তিনদিনের সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়। অন্য প্রদেশে একদিন করে ছুটি দেওয়া হয়।

অষ্ট্রেলিয়া মুসলিম প্রধান দেশ নয়। তবুও ১৯৮৭ সাল থেকে সেখানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সিডনী ক্যানবেরা, মেলবোর্ণ ইত্যাদি মহানগরীতে ঈদের উৎসব নিয়মিত পালিত হয়ে আসছে।

ঈদের খাবার 

Eid al-Fitr meal in Malaysia. By Syefri Zulkefli from Shah Alam, Malaysia – Food Galore, CC BY-SA 2.0, Link

ঈদের সকাল মানেই মায়ের হাতের সেমাই ফিরনি পায়েস। এগুলা ছাড়া কি ঈদ জমে ? আর চটপটি ফুচকার কথা নাহয় নাইবা বল্লাম। তবে এগুলো আমাদের ঈদের খাবার। হ্যাঁ স্থান ভেদে ঈদের খাবারেও ভিন্নতা আছে। ভারতীও উপমহাদেশে দেশগুলোতে খাবারগুলো মোটামুটি একই রকম মূলত মুঘলদের কারনে। ভারতীও উপমহাদেশের সাথে আর যে দেশের মিল আছে সেটা সোমালিয়া। তারাও হালুয়া (‘জালোয়া’) খায়। কেক বানায় আফগানরা, নাম ‘ওয়া কোলচা’। ঈদে ইন্দোনেশিয়ানরা কুয়ে লাপিস (Kue Lapis) নামের একধরনের মিষ্টান্ন জাতীয় খাদ্য তৈরি করে।  এই খাবারটি নানা রঙের ও নানা লেয়ারের কেকের মত। ঈদের নামাজের আগে তারা এই খাবারটি গ্রহন করে। এছাড়াও এক ধরনের পিঠা তৈরি করে তারা যা  বাঁশে ভরে রান্না করা হয়। নাম ‘লেমাং’। ‘লেমাং’ নামের এই পিঠা বানানো হয় মালয়েশিয়াতেও। মরিশাসের লোকদের সাথে যেন মিল আছে আমাদের পুরান ঢাকার মানুষজনের। বিরিয়ানি না হলে যে তাদের উৎসবই জমে না।

পরিশেষে বলা যায় যে স্থান কাল ভেদে ঈদের উৎসব উদযাপনে ভিন্নতা থাকলেও ঈদের উদ্দেশ্য কিন্তু একটাই আর তা হল এক আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভ। আর তাই সকলের উচিত ঈদ-উল-ফিতরের পবিত্রটা বজায় রাখা। সিয়াম পালনের মাধ্যমে আত্মার পবিত্রতা, সংযম, সহনশীলতা ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কাজে লাগাতে হবে। ঈদ-উল-ফিতর যেন ভোগবাদী পাশবিক মহাযজ্ঞে পরিনত না হয়ে উঠে – সেই বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে।

সকলকে পবিত্র ঈদ-উল- ফিতরের অগ্রীম শুভেচ্ছা। ঈদ সকলের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ

Author

Recent Posts

Leave a Reply

4 × one =

Close Menu