মহাশূন্য সম্পর্কিত সদ্য আবিষ্কৃত কিছু তথ্য যা আপনাকে অবাক করবে

মহাশূন্য সব সময়ই মানুষের জন্য একটি অতি আকর্ষণীয় বস্তু। স্পেস ট্রাভেল, মহাশূন্যে কলোনি তৈরি অথবা সবুজ পৃথিবীর বাইরেও প্রানের অস্তিত্ব আছে কি না তা জানার কৌতূহল মানুষের বহু দিনের। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম মহাশূন্য মানুষকে টেনেছে চুম্বকের মতো। আমাদের পূর্ববর্তী জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদরা তাদের নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে আবিষ্কার করেছিলেন মহাশূন্য সম্পর্কে নানা রকম চমকপ্রদ তথ্য। কিন্তু আজকে আমরা এমন কিছু তথ্য নিয়ে এসেছি যেগুলো বিজ্ঞানীরা কিছু দিন আগে আবিষ্কার করেছে।

গত এক দশকের মহাশূন্য গবেষণা জ্যোতির্বিজ্ঞানকে নিয়ে গিয়েছে এক নতুন উচ্চতায়। নতুন গবেষণা যেমন আগের অনেক মতবাদকে বাতিল করেছে তেমন পুরনো অনেক মতবাদকে স্বীকার করে নিয়েছে। তো আসুন জানি এমনই কিছু সদ্য আবিষ্কৃত জ্যোতির্বিজ্ঞানের তথ্য।

পৃথিবী সদৃশ গ্রহ

Gliese 667 Cc sunset.jpg

২০১৩ সালে নাসার জ্যোতির্বিদরা ঘোষণা দেয় জে, শুধু আমাদের আকাশগঙ্গায় (মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি) প্রায় ২০ কোটি গ্রহ রয়েছে যেগুলোর পরিবেশ পৃথিবীর মত (এবং সেখানে জীবনের সম্ভাবনা আছে)। মহাবিশ্বের কোটি কোটি গ্যালাক্সির কোটি কোটি গ্রহে জীবন ধারণের মত পরিবেশ আছে বলে জানিয়েছে নাসা। যা পারতপক্ষে এলিয়েনের অস্তিত্বের ধারণার পালে হাওয়া দেয় বৈকি!

প্লুটো হারিয়ে যায় নি
undefined
প্লুটো

২০০৬ সালে যখন প্লুটোকে পূর্ণাঙ্গ  গ্রহ থেকে বামন গ্রহ বলে ঘোষণা দেয়া হল, স্পেস লাভেরদের বিষয়টি  অবাক করেছিল। কিন্তু সব হিসাব পাল্টে যায় যখন নিউ হরাইজনস মহাকাশযানটি ২০১৫ সালে প্লুটোর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। মহাকাশযানটির প্রোব আবিষ্কার করে, প্লুটোর যথেষ্ট শক্তিশালী একটি মাধ্যাকর্ষণ বলয় রয়েছে। এবং একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রহের মত সব বৈশিষ্ট্যই এর আছে।

নক্ষত্রের সংঘর্ষে স্বর্ণের উৎপত্তি

স্বর্ণ পৃথিবীর দুর্লভতম ধাতুগুলোর একটি। এবং বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর স্বর্ণের উৎপত্তি সম্ভবত নক্ষত্রের সংঘর্ষের কারনে হয়েছে। লোহা এবং কার্বনের মত স্বর্ণ গ্রহ বা নক্ষত্রের মধ্যে সৃষ্টি হয় না। হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের গবেষণা প্রধান এডো বার্গার এবং সহকর্মীরা পৃথিবী থেকে ৩.১ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের দু’টি  নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলাফল বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে আসেন।

গডজিলা আফ আর্থ

আমাদের পৃথিবী একটি বৃহত আকারের পাথুরে গ্রহ, কিন্তু ২০১৪ সালে বিজ্ঞানীরা কেপলার 10c নামের একটি গ্রহ আবিষ্কার করে যা পৃথিবীর আকারের দ্বিগুণ বড় এবং ১৭ গুন বেশি ভারী। সাধারণত এই সাইজের গ্রহগুলো গ্যাসীয় গ্রহ হয়ে থাকে যেমন, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন। কিন্তু কেপলার 10c একটি পাথুরে গ্রহ। এটাকে গডজিলা আফ আর্থ নামেও ডাকা হয়।

শনি এর বিশাল নতুন রিং

সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা শনি গ্রহের একটি বিশাল নতুন রিং আবিষ্কার করেছেন। শনি গ্রহের পৃষ্ঠ থেকে ৬-১৮ মিলিয়ন মাইল (৩.৭-১১.১ মিলিয়ন কি.মি.) উপরে অবস্থিত নতুন রিংটি আগের রিং এর বিপরীত দিকে অবস্থিত। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী, এনি ভেরবিসকার মতে, “এটি একটি সারপ্রাইজড রিং।” এটি সম্প্রতি একটি ইনফ্রারেড টেলিস্কোপ ব্যবহার করার সময় আবিষ্কৃত হয়েছে।

মহাশূন্যের সবচে বয়স্ক নক্ষত্র
He1523a.jpg
HE 1523-0901 By ESO, European Southern Observatory – http://www.solstation.com/x-objects/he1523.htm, CC BY 4.0, Link

 

HE 1523-0901 একটি বৃহৎ লাল নক্ষত্র যা আকাশগঙ্গায় অবস্থিত এবং পৃথিবী থেকে প্রায় ৭৫০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। বিজ্ঞানীরা এটাকে সেকেন্ড জেনারেশন, পপুলেশন ২ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ইউরোপিয়ান সাদার্ন অবজারভেটরি মতে, এই নক্ষত্রটির বয়স প্রায় ১৩.২ বিলিয়ন বছর যা প্রায় মহাবিশ্বের বয়সের সমান।

মঙ্গলে সুনামি!
মঙ্গল গ্রহ
মঙ্গল গ্রহ

রহস্যময় লাল গ্রহ মঙ্গল। সম্প্রতি  বিজ্ঞানীরা এমন কিছু প্রমান পেয়েছেন যেগুলো ইঙ্গিত করছে যে, মঙ্গল গ্রহ সুনামি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলো। প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগে ১৫০ মিটার উচ্চতার একটি গ্রহাণু মঙ্গলে আছড়ে পড়লে এই সুনামির সৃষ্টি হয়। গ্রহের উত্তরাঞ্চলে ১৫০ মিটারের গ্রহাণুটি বিশাল গর্তের সৃষ্টি করে। আচ্ছা সুনামির জন্য তো পানির প্রয়োজন, মঙ্গলে কি পানি আছে ? হ্যাঁ, অন্তত ৩০০ কোটি পূর্বে ছিল। এবং পানি থাকার পক্ষে বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট প্রমানও পেয়েছেন।

মহাশূন্যে অক্সিজেন

অক্সিজেন, হাইড্রোজেন এবং হিলিয়ামের পরে মহাবিশ্বে সবচে কমন উপাদান। এবং প্রান ধারনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদনও এই অক্সিজেন। ২০১১ সালে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা মহাশূন্যে অক্সিজেন অণুর অস্তিত্ব পাওয়ার কথা দাবি করে। পৃথিবী থেকে ১,৫০০ আলোকবর্ষ দূরে ওরিয়ন নেবুলার অঞ্চলে অক্সিজেন অনুর সন্ধান পেয়েছেন তারা।

মহাবিশ্বের ঠান্ডাতম স্থান।

মহাবিশ্বের সবচেয়ে ঠান্ডা জায়গাটি বুমেরাং নেবুলা, সূর্যের মতো আকারের একটি নক্ষত্র ধ্বংসের পর এর গ্যাস আর ধুলোর কারনে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা -৪৫৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট। ১৯৯৫ সালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার এই বিষয়টি বিষয়টি প্রকাশিত হয়।

ক্ষুদ্রাকার গ্রহ
মহাশূন্য
কেপলার-৩৭বি photo: Public Domain

এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচে ছোট গ্রহটি ২০১৩ সালে নাসার কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ এর সাহায্যে আবিষ্কৃত হয়। কেপলার ৩৭ বি নামধারী, গ্রহটি আমাদের চাঁদের চেয়ে সামান্য বড়। সূর্যের মত একটি নক্ষত্রকে (নাম কেপলার ৩৭) এটি সহ আরো ২ টি গ্রহ প্রদক্ষিণ করছে। যার একটির নাম কেপলার-৩৭সি ও কেপলার ৩৭ডি। কেপলার-৩৭ নক্ষত্রকে একবার প্রদক্ষিণ করতে কেপলার ৩৭বি, কেপলার ৩৭ সি এবং কেপলার ৩৭ডি গ্রহগুলো সময় নেয় যথাক্রমে ১৩, ২১ ও ৪০ দিন।

বিশাল হীরা নক্ষত্র!

গ্রিন ব্যাঙ্ক টেলিস্কোপ, ভেরি লং বেসলাইন অ্যার এবং ন্যাশনাল রেডিও অ্যাস্ট্রনমি অবজারভেটরির সাহায্যে এই নক্ষত্রটি খুঁজে পেয়েছেন ডেভিড কাপলান ও তার দলের সদস্যরা ২০০৪ সালে। BPM 37093 (V886 Centauri) নামের নক্ষত্রটি একটি ভেরিয়েবল (ভেরিয়েবল তারকা মানে যে তারকার উজ্জ্বলতা পৃথিবী থেকে দেখা যায়) সাদা বামন তারকা যা পৃথিবী থেকে প্রায় ৫০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আকারে আমাদের চাঁদের সমান নক্ষত্রটিতে যে পরিমান হীরা রয়েছে তা হীরা মাপার এককে পরিমাপ করলে হবে প্রায় ১০ ডিকলিয়ন (১০৩৩ বা ১০ এর পর ৩৩ টা ০) ক্যারেট।

Author

Recent Posts

Leave a Reply

sixteen − eleven =

Close Menu