হিমালয় পর্বতমালাঃ ভয়ংকর সৌন্দর্যের প্রতীক

হিমালয় পর্বতমালা  (হিম+আলয় = বরফের ঘর) এশিয়ার একটি পর্বতমালা যা তিব্বতীয় মালভুমি থেকে ভারতীয় উপমহাদেশকে পৃথক করেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, চীন, নেপাল ও ভূটান এশিয়ার এই পাঁচ দেশে বিস্তৃত হিমালয় পর্বতমালায় মাউন্ট এভারেস্ট, কে ২, কাঞ্চনজঙ্ঘা প্রভৃতি বিশ্বের উচ্চতম শৃঙ্গগুলি অবস্থান করছে। নেপালের প্রায় 75% হিমালয় দ্বারা আচ্ছাদিত। এই পর্বতমালা থেকে বিশ্বের তিনটি প্রধান নদী সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র তাঁদের বিভিন্ন প্রধান ও অপ্রধান উপনদীসহ উৎপন্ন হয়েছে। হিমালয় এর আশপাশের অঞ্চলের আবহাওয়াকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।

হিমালয়
The general location of the Himalayas mountain range

হিমালয় মানুষের কাছে সবসময়ই একটি রহস্য হয়ে আছে। রাজসিক উচ্চতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হিমালয়, তুষারপাতের  পর্বতমালা, উপত্যকা, হিমবাহ, নদী এবং বিভিন্ন ও সমৃদ্ধ গাছপালা দিয়ে সাজানো এই পর্বতশ্রেণী  যেন ভয়ংকর সৌন্দর্যের প্রতীক। ২৯,০২৯ ফুট (8,848 মি) উচ্চতা নিয়ে মাউন্ট এভারেস্ট শুধু হিমালয়ের নয়, বরং এটিই সমগ্র পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দু। আগে সবাই জানতো, পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু চূড়া হল কাঞ্চনজক্সঘা। এই পর্বতশৃঙ্গটিও হিমালয়ে, এভারেস্টের কাছাকাছি। পরে এভারেস্টের খোজ পাওয়া গেলে শুরু হল শৃঙ্গটি মাপার কাজ। এই শৃঙ্গটির উচ্চতা মেপে বের করার কাজটি করেছিলেন এক বাঙালি, রাধানাথ শিকদার, ১৮৫২ সালে। এর পরেই ইংরেজরা লেগে যায় এর মাপজোখে। বৃটিশ ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল অ্যান্ড্রু ওয়াহ করেন সেই মাপজোখের কাজ। আর তাতে লেগে যায় কয়েকটা বছর। ১৮৬৬ এর মার্চ মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, কাঞ্চনজক্সঘা নয়, পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ আসলে এভারেস্ট।

By Sudan ShresthaOwn work, CC BY-SA 3.0, Link

তবে তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোন নাম দেওয়া হয়নি এভারেস্টের। তবে নেপালিরা হিমালয়কে “সাগারমাতা” বলে ডাকতো। যার মানে পৃথিবীর দেবী। এছারাও এর কিছু অঞ্চলিক নামছিল। যেমনঃ দার্জিলিংয়ে শৃঙ্গটির নাম দেওদুক্সঘা, তিব্বতে শৃঙ্গটির নাম চমোলুংমা। কিন্তু সবার কাছে প্রচলিত কোন নামছিল না । জেনারেল অ্যান্ড্রু ওয়াহ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকর্তা কর্নেল স্যার জর্জ এভারেস্টের নামে নামকরণ করলেন এভারেস্টের, যিনি উনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতে কর্মরত ছিলেন।

Indus River By Sundeep bhardwajOwn work, CC BY 3.0, Link

 

আচ্ছা, কখনো ভেবেছেন, এতো যে উঁচু হিমালয়, সেটা তৈরি হলো কি করে?

হিমালয় হলো টেকটনিক প্লেট সংঘর্ষের ফলাফল। মূলত ভারতীয় প্লেট ও এশিয়ান প্লেটর মধ্যে এক সংঘর্ষের ফলে হিমালয়ের সৃষ্টি। আজ থেকে প্রায় ৪ কোটি বছর আগে  গন্ডোয়ানাল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারত পূর্বমুখে ভাসমান অবস্থায় এশীয় স্থলভাগের সঙ্গে ধাক্কা খায়। মধ্যবর্তী টেথিস সাগর দক্ষিণ তিববতের গর্ভে উত্তরমুখী অধোগমনের (subduction) দ্বারা হারিয়ে যায়, আর এই সংঘর্ষ হিমালিয় গিরিজনি বলয়ের সৃষ্টি করে। এবং সেই ৪ কোটি বছর আগে থেকে এখন অব্দি ভারতীয় প্লেট ও এশিয়ান প্লেটর এই সংঘর্ষ জারি আছে। প্রতিবছর প্রায় ৫ সেমি হারে ভারতীয় প্লেটের অব্যাহতভাবে উত্তরমুখী বিচলন একে এশিয়ান প্লেটের ভিতর ঠেলে দিয়েছে এবং ভারতের উত্তর প্রান্তের প্রচন্ড সংঘট (thrusting), হিমালয় পর্বতমালায় ও চীনে চ্যুতি ও ভূমিকম্প, তিববতে ফাটল ও চ্যুতি এবং হিমালয়ের উত্থান, যা আজও বছরে কয়েক মিলিমিটার হারে উঠছে, এসব কিছুই ফলত ব্যাপক সংকোচনের প্রতিফলন। আর এই কারণে এই এলাকায় ভূমিকম্প আনুপাতিকভাবে বেশি অনুভূত হয়। তবে মজার বিষয় হল যে, হিমালয়ের বয়স ৪ কোটি বছর হলেও বয়সের দিক থেকে এটি গ্রহের সবচেয়ে ছোট পর্বতমালাগুলির মধ্যে একটি।

By Luca Galuzzi (Lucag) – Transferred from the English Wikipedia. Original file is/was here. (Original upload log available below.), CC BY-SA 3.0, Link

 

 

ও আর আঙ্কারা এবং এন্টার্কটিকার পরে পৃথিবীতে বরফ এবং তুষারের সমৃদ্ধ তৃতীয় বৃহত্তম স্থান হিমালয়। পুরো হিমালয় জুড়ে  প্রায় ১৫,০০০ হিমবাহ আছে। ৪৮ মাইল দৈর্ঘ্যের (৭২ কি.মি) সিয়াচেন হিমবাহ হল উত্তর বা দক্ষিণ মেরুর বাইরে পৃথিবীর বৃহত্তম হিমবাহ।

 

 

Leave a Reply

four + 1 =

Close Menu
Close Panel