Pirates : পৃথিবীর বিখ্যাত সব জলদস্যুদের কাহিনী।

যারা হলিউড মুভি pirates of the caribbean দেখেছেন তারা নিশ্চয় pirates বা জলদস্যু শব্দের সাথে পরিচিত আছেন। জনি ডেপ অভিনীত এই ছবিটি পেয়েছে তুমুল জনপ্রিয়তা। অথবা জনপ্রিয় গেম ‘আসাসিন ক্রিডঃ ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ’ যারা খেলেছেন তারাও। ওপেন ওয়ার্ল্ড এই গেমটিতে আপনাকে খেলতে হবে এডওয়ার্ড কেনওয়ে নামের চরিত্রটি নিয়ে যে একজন pirates। যদিও সেখানে জলদস্যুদের দেখানো হয়েছে সুপার হিরো বা নায়ক হিসেবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ঠিক তার উল্টো। খুন, রাহাজানি, লুটতরাজ, ধর্ষণসহ হেন কোন অপরাধ নেই যা তারা করে নি।

জলদস্যুতার ইতিহাস কিন্তু বহু বছরের পুরনো। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, সর্বপ্রথম প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১৪ শতকে ‘সী পিপলরা’ (এই সী পিপলদের পরিচয় নিয়ে ইতিহাসবিদরা এখনো ধাঁধায় আছেন। ব্রোঞ্জ যুগের পতনের সময় ১২০০-৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এরা মিশর এবং ভূমধ্যসাগরের পূর্ব অঞ্চলে লাগাতার হামলা চালায়।মিশরীয় সভ্যতার জন্য এই সময়টাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়) এজিয়ন এবং ভূমধ্যসাগরীয় সাগরের উপকূলে গড়ে ওঠা শহরগুলোতে আক্রমন করে।

আবার অনেক সময় জলদস্যুরা সরকারের অনুমতিতে জলদস্যুতার কাজ করতো! অবাক হচ্ছেন ? আশ্চর্যজনক হলেও ঘটনা কিন্তু সত্য। যদিও তাদের বলা হতো প্রাইভেটিয়ার নামে। কিন্তু তাদের কাজের ধরণ এবং নিশংসতা ছিল জলদস্যুদের মতই। ১৩ শতকের শুরু থেকেই প্রাইভেটিয়ারা বিভিন্ন দেশের নেভিতে কমিশন পেতে শুরুকরে কিন্তু ১৭ শতকে বিভিন্ন দেশের নৌবহরে প্রাইভেটিয়ারদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় এবং যুদ্ধ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে প্রথম এংলো ডাচ যুদ্ধের কথা। ইংলিশদের মত ডাচরাও আমেরিকায় উপনিবেশ গেড়েছিল। ১৬৫০ এর দশকে বাণিজ্য নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধের সুত্রপাত ঘটে। ১৬৫২-৫৪ সালের প্রথম এংলো ডাচ যুদ্ধে ইংল্যান্ড রানী প্রথম এলিজাবেথের পরোক্ষ অনুমোদনে (যদিও তিনি তা কখনই স্বীকার করেন নি) প্রাইভেটিয়ারদের ব্রিটিশ রয়েল নেভিতে নিয়োগ দিতে শুরু করেন। যাদের কাজ ছিল ডাচ বাণিজ্য জাহাজগুলো লুঠ করা! এই যুদ্ধে ব্রিটিশ প্রাইভেটিয়াররা প্রায় ১০০০ ডাচ বাণিজ্য জাহাজ লুঠ করে। এমনকি ১৭ এবং ১৮ শতকের শুরুর সময় পর্যন্ত ব্রিটিশ রয়েল নেভিতে সাধারণ নাবিকের তুলনায় প্রাইভেটিয়ারের সংখ্যা বেশি ছিল। এর পর প্যারিস এবং ডাচরা রাজার অনুমতিতে প্রাইভেটিয়ার নিয়োগ দেয়া শুরু করে । ১৭ শতকের শুরুর দিকে পরিস্থিতি ইংল্যান্ডের এতোই খারাপ হয়ে পড়েছিল যে, তাদের বাণিজ্য জাহাজগুলোর নিরাপত্তার জন্য বাজেট বরাদ্দ করে ১৭০৮ সালে ‘Cruisers and Convoys Act’ নামের একটি আইন পাশ করায়!

পরবর্তীতে (রানী প্রথম এলিজাবেথের পরবর্তী সময়) প্রথম জেমস এবং প্রথম চার্লসের রাজত্ব কালে প্রাইভেটিয়ার নিয়োগ দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। মূলত  ১৭৮৫ থেকে ১৮২৩ সালে অধিকাংশ প্রাইভেটিয়ার তাদের রয়েল নেভির চাকরি হারায়। এবং ১৮৫৬ সালের ‘প্যারিস ঘোষণার‘ মাধ্যমে প্রাইভেটিয়ার নিয়োগ দেয়া চিরতরে বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে রয়েল নেভির এবং আমেরিকায় কলোনি করা অন্যান্য দেশের প্রাইভেটিয়াররা বেকার হয়ে যায়, যাদের অনেকেই পরবর্তীতে pirates বা জলদস্যু হিসেবে নাম লেখায়।

আমাদের আজকের আয়োজন এমনই কিছু pirates বা জলদস্যুদের নিয়ে যারা রাজত্ব করেছিলো বিশাল নীল সাগরে। যারা ধ্বংস করেছিলো বন্দরের পর বন্দর। খুন করেছিলো হাজার হাজার মানুষ আর লুঠ করেছিলো তাদের সম্পদ।

উইলিয়াম কিড

উইলিয়াম “ক্যাপ্টেন” কিড ছিলেন একজন স্কটিশ নাবিক। ভারত মহাসাগর থেকে ফেরার সময় জলদস্যুতার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার এবং পরবর্তীতে ফাঁসি দেওয়া হয়। তবে কিছু ঐতিহাসিকের মতে, ক্যাপ্টেন কিডকে কেবল তার রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে খুন করা হয়েছিলো। তাদের মতে কিড একজন ‘প্রাইভেটিয়ার’ হিসেবেই ভারত মহাসাগরে ‘কাজ’ করছিলেন। মূলত ব্রিটিশ পার্লামেন্টে যখন ক্যাপ্টেন কিডকে নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা করা হয় তখন থেকেই ক্যাপ্টেন কিডের খ্যাতি চারদিকে ছরিয়ে পরে।

১৭০১ সালের ২৩ মে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তার মৃতদেহ টেম্‌স নদীর তীরে ১৭০৪ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ ৩ বছর ফাঁসিকাঠেই ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো। এর কারন ছিল এই বার্তা দেওয়া যে, কারো বিরোদ্ধে যদি জলদস্যুতার অভিযোগ প্রমানিত হয় তবে তাকেও এই একই পরিনতি বহন করতে হবে।

পিটার ইস্টন

পিটার ইস্টন, কর্ম জীবনের শুরুতে ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একজন কর্মচারী। ১৬০২ সালে তিনি রয়েল নেভিতে প্রাইভেটিয়ার হিসেবে নিয়োগ পান। ১৬০৪ সালে প্রাইভেটিয়ারের চাকরি হারানোর পর বনে যান পুরোদুস্তর pirates. সোনার খোঁজে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ভূমধ্য সাগরের স্প্যানিশ জাহাজগুলোকে আক্রমন করতেন এই পিটার ইস্টন।

১৭ শতকের শুরুর দিকে ‘নিউ ফাউন্ড ল্যান্ড’ উপকূলের হার্ভার গ্রেস থেক ফেরীল্যান্ড অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল পিটার ইস্টনের সমুদ্র রাজত্ব। মূলত ১৬১১ থেকে ১৬১৪ সালে তার প্রতাপ এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিলো যে, কোন দেশের নেভি বা pirates hunter তাকে ঘাটাতে সাহস করতো না! কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে তাকে নিয়ে কখনওই তেমন আলোচনা হয় নি।

এডওয়ার্ড টিচ

pirates
আসাসিন ক্রিডঃ ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ গেমে ব্ল্যাকবিয়ার্ড। photo: fair use

 

কুখ্যাত দস্যু এডওয়ার্ড টিচ সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন ‘ব্ল্যাকবিয়ার্ড’ নামে (এছাড়াও তার আরো কিছু উপনাম ছিল যেমন, টাক, থাক, থাচি ইত্যাদি) মূলত এই নামটি দেওয়া হয়েছিলো তার লম্বা কালো দাড়ি এবং ভয়ঙ্কর চেহারার জন্য। আমেরিকার পূর্ব উপকূল এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের আশপাশের বিশাল জলসীমায় ছিল তার বিচরণ ভূমি। ইংরেজ এই pirates এর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা সম্পর্কে খুব কম জানা যায়। ধারণা করা হয়, ১৬৮০ সালে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে জন্ম নিয়েছিলেন ব্ল্যাকবিয়ার্ড খ্যাত এডওয়ার্ড টিচ। এবং সম্ভবত জলদস্যুদের মধ্যে তিনিই সবচে বেশি বিখ্যাত। অন্যান্য অনেক pirates এর মতো তিনিও কর্ম জীবন শুরু করেছিলেন একজন প্রাইভেটিয়ার হিসেবে। queen anne’s  যুদ্ধের সময় তিনি একটি প্রাইভেটিয়র জাহাজের নাবিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

নেতা হিসেবে ব্ল্যাকবিয়ার্ড ছিলেন একজন নিখুঁত হিসাবী এবং কর্মঠ। কথিত আছে এডওয়ার্ড টিচ তার বিখ্যাত লম্বা দাড়ি দিয়ে ঘষে আগুন জ্বালাতে পারতেন। জাহাজ লুঠের সময় তিনি তার ভয়ঙ্কর চেহারা দেখিয়ে এবং লম্বা দাড়িতে বিশেষভাবে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখিয়ে প্রভাবিত করতেন।

জাহাজ লুণ্ঠনের  অদ্ভুত একটি কৌশল ছিলো এডওয়ার্ড টিচের, প্রথম তিনি কোনো জাহাজকে দিগন্তরেখায় হারিয়ে যেতে দিতেন পরে দ্রুত বেগে ধাওয়া করে জাহাজের সর্বস্ব লুট করে নিতেন। এছাড়াও আরো অনেক বিষয়ে যথেষ্ট খামখেয়ালী ছিলেন তিনি। যেমন বলা যায় তার কুইন অ্যানি’স রিভেঞ্জ জাহাজের কথা। তিনি জাহাজটিকে সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন যেন তার অধীনস্থ জলদস্যুরা তাদের ভাগের অংশ দাবি করতে না পারে!  এছাড়াও একবার জাহাজ লুট করার পর মুক্তিপণ হিসেবে শুধু ওষুধ দাবি করে ছিলেন!

ফ্রাঙ্কস ল’আলোননিস

১৬৫০ সালে ফ্রাঙ্কস ল’আলোননিস (Francois L’Ollonais) ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে আসেন একজন ক্রীতদাস হিসেবে। ১৬৬০ সালে দাসত্ব থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্তি পান। এরপর ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলোতে ভ্রমণ করতে শুরু করেন। সেন্ট-ডমিংয়েগুতে পৌঁছে আত্মপ্রকাশ করেন pirates হিসেবে।

pirates হিসেবে  আত্মপ্রকাশ করার এক অথবা দুই বছর পর ক্যাম্পেচের(দক্ষিণপূর্ব মেক্সিকো একটি রাজ্য) কাছে এক স্থানে তার জাহাজ ডুবে যায় যখন স্প্যানিশ সৈন্যদের একটি দল তাদের আক্রমন করে। ফ্রাঙ্কসের অধিকাংশ ক্রু এই সময় মারা যায়। ফ্রাঙ্কস নিজে রক্তাক্ত অবস্থায় অন্যান্য মৃত ক্রুদের মাঝে লুকিয়ে থেকে সে যাত্রায় বেঁচে যায়। অল্প কিছু ক্রু সহ টরটুগা দ্বীপে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে সম্পূর্ণ টরটুগা দ্বীপটিকেই জিম্মি করেন এবং স্প্যানিশ শাসকদের কাছ থেকে মুক্তিপণ দাবি করেন।

(চলবে)

Author

Recent Posts

Leave a Reply

fifteen − four =

Close Menu